suicide notes

 

সুইসাইড নোট

 

গল্পকার - আব্দুল মাতিন

 

 

 

শিবম এক প্রাইভেট কোম্পানিতে কর্মরত,একদিন তার বন্ধুদের বলল জানিস গতকাল এক জাগায় গেছিলাম, নিজেকে কিছুটা ফ্রেশ করতে। ফিরে আসার সময় মেয়েটি আমার হাতে একটা চিঠি দিয়ে অনেক কাকুতি মিনতি করে বলল পোস্ট করে দিতে, আমি না করতে পারলাম না।

বন্ধুরা - বলল আরে খুলে দেখ কী লিখেছে। সে খুলে পড়তে শুরু করল, লিখা রয়েছে...

 

 

 

 

 

           আমার নাম চম্পা সবাই চাঁদনি বলে ডাকে। জন্ম শহর কোলকাতার এক পল্লীতে। বাড়িতে সদস্য আমি আর আমার মা। আমাদের থাকার ঘর বলতে ছিল দুটি ছোট রুম, একটাতে আমি থাকতাম সেটাতে ছিল ছোট্ট একটা ফ্রিজ, একটা টেলিভিশন এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় আসবাব পত্র, আর একটা রুম ছিল যেটাতে আমার যাওয়া পুরোপুরি বারণ ছিল।

 

 

 

 

 

       ছোট্ট থেকেই দেখতাম আমাদের বাড়িতে অনেক অপরিচিত ব্যক্তিরা আসত, আর তারা ঐ পাশের ঘরটায় মায়ের সাথে কিসব আলোচনা করে একটু পরে চলে যেত। জীবনে কোনদিন বাবাকে দেখার সৌভাগ্য হয়ে ওঠেনি। বাবার আদর কী জিনিস তা আমি কোন দিন জানতাম না। একদিন মাকে বাবার ব্যপারে জিজ্ঞাসাও করেছিলাম, মা কোন উত্তর করেনি, আমার প্রশ্ন শুনে মা আমার দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে ছিল, যেন আমি বড় কিছু একটা অপরাধ করে ফেলেছি।

 

 

 

 

 

          কিছুটা বড় হতেই আমি বুঝে গেছিলাম, ঐ ব্যক্তিরা কেন আসত? আর কেনই বা আমার ঐ ঘরটায় প্রবেশ নিষেধ ছিল। স্কুলের কেউ আমার সাথে তেমন মিশত না, আমার বন্ধু বলতে একজনই ছিল সেও আমাদের পল্লীতেই থাকত তার নাম ছিল অর্নব।

 

 

 

 

 

         আমরা একই সাথে স্কুলে যেতাম - আসতাম, একসাথে টিফিন ভাগ করে খেতাম, খুব মজা করতাম, যদিও সে আমার থেকে দু ক্লাস সিনিয়র। এই ভাবে আমার স্কুল জীবন কেটে গেল। সবে মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে একদিন অর্নব এসে বলল - এই চাঁদনি চল না আমরা একটু ঘুরে আসি? কোনো কিছু না ভেবেই আমি সম্মতি জানালাম। মাকে বললাম সে তেমন কোনো বাধা দিল না শুধু দিল একটা সাবধান বাণী। পরের দিন সকালে মাকে প্রণাম করে আমরা একসাথে বার হলাম।

গাড়িতে উঠে আমি জিজ্ঞেস করলাম আমারা কোথায় যাব?

 

অর্নব বলল শান্তিনিকেতনে। শুনেই আমার মন খুশিতে নেচে উঠল। রবি ঠাকুরের গল্প তাঁর আশ্রমের গল্প অনেক কিছুই বইতে পেরেছি, স্যারদের কাছে শুনেছি, কিন্তু আমি নিজে আজ সেখানে যাচ্ছি আমার যেন বিশ্বাসই হচ্ছিলনা।

 

 

 

 

 

        এগারোটার সময় আমরা শান্তিনিকেতনে পৌঁছলম। ঠঠিক করলাম আজকে সারাটা দিন সব কিছু দেখে রাত্রের ট্রেনে বাড়ি ফিরব। প্রথমে গেলাম রবীন্দ্র ভবন। অর্নব গিয়ে টিকিট কেটে আনল। ভিতরে গিয়ে দেখলাম রবিঠাকুরের অমূল্য অমূল্য সব পুরস্কার একটা মিউজিয়ামে সব সাজানো রয়েছে, রয়েছে তাঁর নিজের হাতের লেখা পান্ডুলিপি, তার ব্যবহার জুতো! আর অনেক কিছু।

 

   অনেক ঘুরাঘুরি করার ফলে আমরা অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম, অর্নব বলল আজ রাতটা না হয় কোনো লজে কাটিয়ে কাল যাওয়া যাবে। আমিও কিছু বললাম না কারণ ওর সাথে সময় কাটাতে আমার ভালোই লাগছিলো। অর্নব সুন্দর ঝকমকে একটা রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেল।

 

 

 

 

 

        এখানে আসার পর আমার কেমন যানো ভয় করছিল, মনে এক অজানা আতঙ্ক সঞ্চার করছিল। মনে হচ্ছিল এখানে না এসে বাড়ি ফিরে গেলেই ভালো হত। যাইহোক রাত্রে ডিনার সেরে গল্প করছিলাম, এমন সময় আমাদের রুমে তিনজন অপরিচিত লোক এল, এসে অর্নবের সাথে হেঁসে হেঁসে গল্প করতে লাগল, গল্পের ফাঁকে তারা আমার দিকে তাকাচ্ছিল। কিছুটা পর তাদের মধ্যে একজন ব্যাগ থেকে কিছু টাকা বের করে অর্নবের হাতে দিয়ে বলল, পুরো এক লাখ আছে গুনে নাও। এসব দেখে আমার সন্দেহ হতে লাগলো, ভয় আর বেড়ে গেল, শরীর ঘামতে লাগল। আমি অর্নবকে জিজ্ঞাসা করলাম এরা কারা আর তোমায় কেনই বা টাকা দিচ্ছে? সে বলল তোমার ভয়ের কোন কারণ নেই এরা সবাই আমার পরিচিত।

 

 

 

 

 

       পরের দিন যখন আমি ঘুম থেকে উঠলাম, তখন দেখি আমার মাথা ঝিম ঝিম করছে, অর্নব পাশে নেই। জায়গাটাও অপরিচিত, আমি কিছুই ভেবে উঠতে পারছিলাম না এমন সময় এক ব্যক্তি আমার ঘরে প্রবেশ করল, দেখলাম সেই লোক যে অর্নবকে কাল রাতে টাকা দিয়েছিল। আমি তাকে অর্নবের ব্যপারে জিজ্ঞাসা করতেই সে বলে উঠল, সুন্দরী তুমি এখন আমাদের মেহমান, তোমাকে এখন আমাদের আদেশ মত কাজ করতে হবে, আর হাঁ কোনো রকম চালাকি করার চেষ্টা করলে মারাত্নক ফল ভোগ করতে হবে মনে রেখ। এই বলে সে একটা অট্য হাঁসি দিয়ে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর এক অপরিচিত লোক এল, যার বয়স প্রায় 45 এর কাছাকাছি হবে, আমি তাকে আমার বিপদের সব কথা খুলে বললাম সে শুনেও শুনল না। বরং আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, আমার কোমল শরীরটা হায়েনার মত ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেল, অনেক কাকুতি মিনতি করলাম, তার পায়ে ধরলাম, বললাম আমি আপনার মেয়ের মত, প্লীজ আমাকে ছেড়ে দিন, আমার জীবনটা এভাবে নষ্ট করবেন না।সে আমার কোনো কথায় কান দিল না, বরং মনে হচ্ছিল আমার আর্তনাদে সে আরো আনন্দিত হচ্ছিল। পুরো এক ঘন্টা ধরে অভুক্ত জঙ্গলি জানয়ারদের মত আমাকে খেল, এত কান্না, অনুনয়-বিনয় করে আমার কোনো লাভ হল না, চোখ দিয়ে জল গরিয়ে পড়ল, দেখলাম পুর শরীর রক্তাক্ত হয়ে গেছে, শরীরের ব্যাথায় নড়াচড়া টুকু পর্যন্ত করতে পারছিলাম না হঠাৎ আমার জীবনটা এমন নরকময় কেন হয়ে উঠল, মাকে খুব মনে পড়ছিল।

 

প্রত্যেকদিন একইরকম অত্যাচার আমাকে সহ্য করতে হয়, কোনো কোনো দিন আট দশজন পর্যন্ত আসে আর তাদের ক্ষুধা মিটিয়ে চলে যায়। নিজেকে প্রশ্ন করি কী আমি অপরাধ করেছিলাম, কার কী ক্ষতি করছিলাম

 

 

 

           অবশেষে উত্তর পেলাম আমি একজন মহিলা এটাই আমার সব থেকে বড় অপরাধ। মা তুমি আমায় ক্ষমা করো আমার এই পত্র তুমি যখন পড়বে তখন আমি আর এই দুনিয়ায় থাকব না। আজ আমি সুইসাইড করছি।

 

 

 

ইতি               

তোমার আদরের চাঁদনি।

 

 

 

শিবম শেষ লাইনটা পড়ে যখন তার বন্ধুদের দিকে তাকাল, দেখল সবার চোখে জল....

Comments

Popular posts from this blog

Thought